ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রেসঃ মুফতী আমিনী রহ. ছিলেন এদেশের কোটি জনতার হৃদয়ে স্পন্দন।
-মুফতী কবীর আহমেদ কাসেমী-

মুফতী ফজলুল হক আমিনীকে এদেশের কোটি জনতা মাওলানা মুহাম্মাদুল্লাহ হাফেজ্জী হুজুরের জামাতা আর আল্লামা শামসুল হক ফরিদপুরী (রহিমাহুমুল্লাহ)-এর বিশেষ ছাত্র হওয়ার কারণে ভালোবাসতেন না; বরং তিনি আকাবিরদের আদর্শে অটল থেকে সর্বদা অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার এবং জালিমের সাথে আপোষহীন ছিলেন বলেই সবাই তাঁকে মুহাব্বত করতেন। যাদের শরীরে মুফতী আমিনী (রহ.)-এর রক্ত বইছে এবং যারা বর্তমানে নিজেদেরকে মুফতী আমিনী (রহ.)-এর সৈনিক বলে দাবি করছে, তাদের ক্ষেত্রেও একই কথা। তারা মুফতী আমিনী (রহ.)-এর নীতির ওপর কতটুকু অবিচল আছে সেটাই দেখার বিষয়। মুফতী আমিনী (রহ.)-এর বর্ণাঢ্য জীবন ও সংগ্রাম তো এখনও আমাদের চোখে ভাসছে। ২০১১ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে তাঁর এক খালাম্মার জানাযায় এসেছিলেন। তখনও তিনি অঘোষিত গৃহবন্দী। সে দিন তিনি জামিয়া ইউনুছিয়ায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘জানাযায় আসার সময় প্রশাসন আমাকে শর্ত জুড়ে দিয়েছে আমি যেন সরকারের বিরুদ্ধে কোনও কিছু না বলি। আমিও ওয়াদা দিয়ে ফেলেছি। আমরা তো আর তাদের মত ওয়াদা ভঙ করতে পারি না, তাই আজ জালিম সরকারের নির্যাতন, নীপিড়ন সম্পর্কে মুখ খোলতে পারলাম না’।
তিনি গৃহবন্দী থাকাবস্থায়ই শায়খুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক (রহ.) ইন্তেকাল করেন। আপন উস্তাদের জানাযায় শেষের দিকে গিয়ে উপস্থিত হন। মুফতী আমিনী (রহ.)-এর বক্তৃতা শুনার জন্য কিছু মানুষ শ্লোগান দিতে লাগলো। সে দিনও তিনি মাইক ধরে বললেন, ‘সরকারবিরোধী কোনও বক্তব্য না দেয়ার শর্তে প্রশাসন আমাকে এখানে আসার অনুমতি দিয়েছে’।
এভাবে বাকস্বাধীনতা কেড়ে নিয়ে দীর্ঘ ২২ মাস গৃহবন্দী করে রেখে তাঁকে তিলে তিলে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয় বর্তমান সরকার। সুতরাং এমন জালিমের প্রশংসায় যারা পঞ্চমুখ, তারা কখনও মুফতী আমিনী (রহ.)-এর উত্তরসূরী হতে পারে না।
.
বস্তাভর্তি টাকার অফার মুফতী আমিনী (রহ.)-এর কাছে কম আসেনি। টাকায় কিনতে না পেরে তাঁর ওপর চাপও সৃষ্টি করা হয়েছে। তথাপি তিনি অসত্যের কাছে মাথা নত করেননি। জেল-জুলুমের শিকার হয়েছেন, তবুও সত্যের পথে সংগ্রাম চালিয়ে গেছেন। ‘কুরআনবিরোধী নারী নীতিমালা’ বাতিল করার দাবিতে আন্দোলনের ডাক দিলে তাঁর ছেলেকে গুম করা হয়েছিল। তখন তিনি সাংবাদিক সম্মেলনে দীপ্তকণ্ঠে ঘোষণা দিয়েছিলেন, ‘আমার এক ছেলে কেন হাজার ছেলেকে গুম করলেও আমি আন্দোলন করেই যাবো। আমার এক হাতে কুরআন আর অপর হাতে পরিবার থাকলে আমি কুরআনকেই বেছে নেবো’।
এই ইস্যুতে ৪ঠা এপ্রিলের হরতাল সফল করার জন্য দিনের বেলায় সারা দেশ চষে বেড়িয়েছেন, প্রোগ্রাম থেকে এসে ঈশার নামাযের পর লালবাগ জামিয়ায় হাদীসের মসনদে বসে গেছেন, ছাত্রদের নিয়ে দুআ করছেন, আবার শেষ রাতে ওঠে তাহাজ্জুদে দাঁড়িয়ে গেছেন। প্রায় সময় তিনি রোযা রেখেও রাজপথে আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছেন। কেউ কেউ সরকারের ইশারায় ৪ঠা এপ্রিলের হরতালেও সমর্থন দেয়নি। দেখা গেছে, এতে আন্দোলনে মোটেও প্রভাব পড়েনি। সে দিন তাওহিদী জনতা স্বতঃস্ফূর্তভাবে কাফনের কাপড় পরে ময়দানে নেমে এসেছিল।
.
শত বাধা-বিপত্তিও কাউকে আটকাতে পারেনি। জামিয়া রহমানিয়ার ছাত্ররা তো গেইট ভেঙে রাস্তায় নেমেছিল। এক দিনেই পুরো দেশ অচল হয়ে গিয়েছিল। নজিরবিহীন এই হরতাল দেখে আসিফ নজরুল রসিকতা করে বলেছিলেন, ‘শুনেছি হাফেজ্জী হুজুর নাকি জ্বীন পোষতেন। এই জ্বীনগুলো পরবর্তীতে মনে হয় আমিনী সাহেবের কাছে চলে আসছে। আর তিনি সে জ্বীনগুলো মাঠে নামিয়ে বোধহয় হরতাল সফল করেছেন। অন্যথায় এই হরতালে এত বিপুলসংখ্যক জনগণ তো অংশগ্রহণ করার কথা নয়’!
মুফতী আমিনী (রহ.) বলতেন, ‘হ্যাঁ, আমার কাছে অস্ত্র আছে। সেগুলো হলো—হাতের তাসবীহ এবং শেষ রাতের চোখের পানি’।
মূলত মুফতী আমিনী (রহ.)-এর ইখলাস এবং খোদাভীতির কারণেই ফতোয়া রক্ষার আন্দোলন থেকে শুরু করে নারী নীতিমালাবিরোধী সংগ্রামও সফল হয়েছিল। তাই কেউ হযরতের আদর্শের বিপরীতে গিয়ে মুফতী আমিনী (রহ.)-এর সাথে গাদ্দারি করবেন না। আলেম-ওলামাদের প্রতি এখনও সাধারণ মানুষের অগাধ বিশ্বাস রয়েছে। যে কোনও আন্দোলনে তারা আলেমদের নেতৃত্বে ঝাঁপিয়ে পড়ে। মুনাফিকি আর দ্বিমূখী আচরণে তাদের সেই আস্থাটা নষ্ট করবেন না।

By khobor

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *